Thursday, November 26, 2015

জেন্ডার বা লিঙ্গ বৈষম্য কী ও কেন?

সেক্স হচ্ছে নারী ও পুরুষের প্রাকৃতিক বা শারীরিক বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে জেন্ডার হচ্ছে সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত নারী ও পুরুষের সামাজিক বৈশিষ্ট্য বা ভূমিকা। সমাজবিজ্ঞানীরা সমাজে নারী ও পুরুষের মধ্যকার সামাজিক ভূমিকার পার্থক্যকে চিহ্নিত করতে জেন্ডার শব্দটি ব্যবহার করেন।

যেমন, সন্তান গর্ভধারন ও পুরুষের মুখে দাড়িগোঁফ ওঠা যথাক্রমে নারী ও পুরুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য। অন্যদিকে, সন্তান প্রতিপালন, রান্নাবান্নার দ্বায়িত্ব এককভাবে নারীর উপর চাপিয়ে দেয়া বা পরিবারের সদস্যদের আর্থিক ভরণপোষণের দ্বায়িত্ব পুরুষের উপর অর্পন হচ্ছে যথাক্রমে নারী ও পুরুষের জেন্ডার ভূমিকা।

জেন্ডার কোন প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নয়। এটা সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত বৈশিষ্ট্য। তাই সমাজ কর্তৃক নির্ধারিত জেন্ডার ভূমিকা অনেক সময় নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করতে পারে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এই নির্ধারিত জেন্ডার ভূমিকার কারনেই সমাজ নারীকে যেমন বিমানের পাইলট হিসেবে দেখতে পছন্দ করে না, তেমনি রান্নাঘরে পুরুষের উপস্থিতিও সমাজ স্বাভাবিকভাবে মেনে নেয় না।

প্রচলিত জেন্ডার ধারণায় নারী হলো দুর্বল, কোমল, আবেগপ্রবণ, শান্ত ও নম্র। অপরদিকে পুরুষদের  কঠোর, সবল, যুক্তিবাদী ইত্যাদি বলে বিবেচনা করা হয়। নারী-পুরুষ সম্পর্কে এসব স্টোরিওটাইপ ধ্যান-ধারনা তৈরির পিছনে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা যেমন দায়ী; তেমনি এর পিছনে ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক প্রভাবও জড়িত।

চর্যাপদকে যদি বাঙলা সাহিত্যের প্রথম নিদর্শন হিসেবে ধরা হয়, তাহলে বাঙালি সংস্কৃতি তথা বাঙালি জাতির বয়স হাজার বছরের কম নয়। এই হাজার বছরের ইতিহাস খুঁজলে সমাজে কেবল নারীর অধস্তন অবস্থাই চোখে পড়ে। শিল্প, সাহিত্য, রাজনীতি, অর্থনীতির মাঠে নারীর অংশগ্রহন থাকলেও সেটা পুরুষের তুলনায় অতি নগণ্য।

নারীদের এই পিছিয়ে থাকার কারন যে তাদের মেধাশক্তি বা যোগ্যতার অভাব ছিল সেটা কিন্তু মোটেই নয়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক যুগে নারীদের সফলতার চিত্র থেকে সহজেই সেটা বোঝা যায়। নারীর এই অধস্তনতার কারন হিসেবে তাই পুরুষতান্ত্রিক ধর্মীয় ও আর্থসামাজিক কাঠামোকে দায়ী করা যায়।

ভারতীয় উপমহাদেশে ইংরেজ শাসনামলে ইংরেজী শিক্ষার বিস্তার, রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন প্রমুখ ব্যাক্তিবর্গের সমাজসংস্কার আন্দোলনের ফলে এদেশে নারী শিক্ষার বিস্তার ও নারী জাগরণের সূচনা হয়।

অতীতের তুলনায় বর্তমানে সবক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহন বাড়লেও নারী এখনো নানা জায়গায় নানা বৈষম্যের স্বীকার হচ্ছে। এসব বৈষম্যের কারন খুঁজতে গেলে সেই পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা, রাষ্ট্রীয় বৈষম্যপূর্ণ আইন-কানুন, ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমিকার উপস্থিতিই দেখা যায়।

জেন্ডার বৈষম্যের আলোচনায় তৃতীয় লিঙ্গ বা ট্রান্সজেন্ডারদের বৈষম্যের কথা আলাদাভাবে না বললেই নয়। আমাদের দেশে সবচেয়ে বেশি বৈষম্যের স্বীকার হয় এই ট্রান্সজেন্ডার সম্প্রদায়ই। সমাজে এদেরকে ব্যাঙ্গ করে 'হিজড়া' বলা হয়। এরা ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্যের পাশাপাশি আইনগত ও রাষ্ট্রীয়ভাবেও বৈষম্যের স্বীকার হয়। বাংলাদেশে তৃতীয় লিঙ্গের স্বীকৃতি না থাকায় এরা জাতীয় পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট তৈরি থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি ও সরকারী চাকরিতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও বৈষম্যের স্বীকার হয়।

মানব জাতির ইতিহাস সভ্যতার উত্থান ও পতনের ইতিহাস। সভ্যতার এই উত্থান-পতনের ইতিহাস রচনায় নারী-পুরুষ উভয়েরই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। একটি আধুনিক, আদর্শ ও উন্নত সমাজ গঠনে নারী-পুরুষ-তৃতীয় লিঙ্গ সবার ভূমিকাকে স্বীকার করে হাতে হাত রেখে কাজ করার বিকল্প নাই।

No comments:

Post a Comment