Tuesday, January 31, 2017

চিন্তার বিবর্তনের ইতিহাসঃ সমাজবিজ্ঞান কী এবং কীভাবে এল?

প্রায় ২.৫ মিলিয়ন বছর আগে পূর্ব আফ্রিকায় বসবাসকারী ‘অস্ট্রালোপিথেকাস’ নামক 'দ্য গ্রেট এইপ' থেকে বিবর্তিত হয়ে আদি মানবেরা সর্বপ্রথম পৃথিবীতে আবির্ভূত হয়। মাত্র এক লক্ষ বছর আগেও পৃথিবীতে কমপক্ষে ছয় প্রজাতির মানব বসবাস করতো। সর্বশেষ  মাত্র ৩০ হাজার বছর আগেও আধুনিক মানব 'হোমো স্যাপিয়েন্সে'র সাথে 'হোমো নিয়ান্ডারথাল'রা এই পৃথিবীর বুকে ঘুরে বেড়াতো। অন্যান্য মানব প্রজাতি পৃথিবীর বুক থেকে হারিয়ে গেলেও হোমো স্যাপিয়েন্স বা আধুনিক মানব প্রজাতি কীভাবে টিকে গেল তা এক বিস্ময়কর ব্যাপার। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, হোমো স্যাপিয়েন্সদের অসাধারন বুদ্ধিমত্তা বা চিন্তার ক্ষমতাই তাদেরকে প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করে টিকে থাকতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে। আর এ কারনেই আধুনিক মানুষের বৈজ্ঞানিক নাম 'হোমো স্যাপিয়েন্স' বা 'বুদ্ধিমান মানব' রাখা হয়েছে। (Harari, 2014)*

হোমো স্যাপিয়েন্স বা আধুনিক মানুষের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তারা চিন্তা করতে পারে। তবে এই চিন্তার ক্ষমতা কিন্তু একদিনে তৈরি হয় নি। সময়ের সাথে সাথে মানুষের চিন্তার ক্ষমতা ও পদ্ধতির উন্নতি ঘটেছে। অজানাকে জানার কৌতূহল আর কোন ঘটনার পেছনের কারন জানতে চাওয়া মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এই প্রবৃত্তি থেকেই আদিম মানুষ তার আশেপাশের 'ঘটনা' কে বোঝা বা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা শুরু করে।

ধর্মতাত্তিক যুগ

আদিম সমাজে সব "ঘটনা"কে ধর্মতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোন থেকে দেখা হত। অর্থাৎ কোন ঘটনার পিছনের কারন হিসেবে স্রষ্টা বা অতিপ্রাকৃত শক্তির ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করা হত।  যেমন- ঝড়-বৃষ্টি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারন হিসেবে অতিপ্রাকৃত শক্তির ইচ্ছা বলে আদিম সমাজ বিশ্বাস করত।

মেটাফিজিক্যাল যুগ

যুগ যুগ ধরে মানুষ এভাবে ধর্মতাত্ত্বিকভাবে চিন্তা করে আসছিল। তবে ধীরে ধীরে মানুষ আর "সবকিছুর পিছনের কারন হিসেবে অতিপ্রাকৃত শক্তির ভূমিকা" বিষয়ক ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি। তারা ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে নিজেদের মত ভাবার চেস্টা করতে শুরু করল।

মূলত এভাবেই দর্শন শাস্ত্রের প্রাথমিক উৎপত্তি হয়েছে বলা যায়। দর্শন মূলত বিশ্বজগৎ, মানুষ ও তার কর্মকান্ডকে ধর্মতাত্ত্বিক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে জাগতিক যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। ধর্মের বাইরে গিয়ে যুক্তির আলোকে বিশ্বজগৎ ও তার কর্মকান্ডকে বিশ্লেষণ করার প্রচেষ্টা মানব ইতিহাসের এক চরম বৈপ্লবিক পরিবর্তন। 

দর্শনের আলোচনার বিষয়বস্তু ব্যাপক। দৃশ্যমান/ অদৃশ্যমান, প্রাকৃতিক/অপ্রাকৃতিক সবকিছু নিয়ে দর্শন আলোচনা করে। এককথায় বলা যায়, আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখার উৎপত্তি স্থল হচ্ছে দর্শন।

বিজ্ঞানের যুগ

এরপরে প্রকৃতি, জগত ও তার কর্মকান্ডকে  আরো ভালভাবে বোঝার জন্য বিজ্ঞানের আবির্ভাব হয়।
দর্শনের সাথে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মূল পার্থক্য হচ্ছে, বিজ্ঞান শুধুমাত্র বাস্তব, দৃশ্যমান (observable) বস্তু/ঘটনা নিয়ে আলোচনা করে। অন্যদিকে দর্শন দৃশ্যমান/অদৃশ্যমান, প্রাকৃতিক/অপ্রাকৃতিক এমনকি কাল্পনিক বিষয় নিয়েও আলোচনা করতে পারে।

বিজ্ঞান ও দর্শনের পর্যবেক্ষন পদ্ধতিও ভিন্ন। দর্শন সবকিছুকে শুধুমাত্র মানবচিন্তা ও যুক্তির আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। অন্যদিকে, বিজ্ঞান সবকিছুকে আনুষংগিক তথ্যপ্রমাণ ও নানারকম বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে ব্যাখ্যা করে।

দর্শনের অবজার্ভেবল বিষয়গুলোকে বিজ্ঞানের হাইপোথিসিসের সাথে তুলনা করা যেতে পারে। অর্থাৎ যখনই দর্শনের কোন বিষয় তথ্যপ্রমান ও বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভিত্তিতে সত্য প্রমানিত হয়; তখন আর সেটা শুধুমাত্র দর্শনে সীমাবদ্ধ থাকেনা, বিজ্ঞানে পরিনত হয়।

সমাজবিজ্ঞানের আগমন

বিজ্ঞানের আবিস্কার মানব সভ্যতার এক চরম মাইলফলক। বিজ্ঞানের জয়জয়াকারের ফলে মানুষ সবকিছুকে বিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করে। কিন্তু মানুষ, সমাজ ও তার কর্মকান্ড "বস্তুজগতের"র মত না হওয়ায় তাকে ব্যখ্যা করা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের জন্য কঠিন হয়ে দাড়ায়। ফলে উৎপত্তি হয় বিজ্ঞানের এক বিশেষ আপডেট ভার্সন সমাজবিজ্ঞান। ;)

সমাজবিজ্ঞান হচ্ছে সমাজের বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ। সমাজ ও তার কর্মকাণ্ডকে নিরপেক্ষভাবে দেখার এবং ব্যাখ্যা করার বিজ্ঞানের নাম সমাজবিজ্ঞান। সমাজবিজ্ঞান মানুষের সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান, প্রথা-প্রতিষ্ঠান ও তার কর্মকাণ্ডের বিজ্ঞানভিত্তিক বিশ্লেষণ করে। মানুষের আচার-অনুষ্ঠান ও কর্মকান্ডের উপর সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রভাব নিয়েও সমাজবিজ্ঞান আলোচনা করে। যেমন- আত্মহত্যাকে ব্যক্তিগত কারন হিসেবে মনে করা হলেও সমাজবিজ্ঞানী এমিল ডুর্খেইম তার সামাজিক গবেষনার মাধ্যমে প্রমান করে দেখান যে আত্মহত্যার পিছনে শুধু ব্যক্তিগত কারনই নয়; এর পিছনে নানা সামাজিক কারণ জড়িত রয়েছে।

সমাজবিজ্ঞান অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে গবেষনা করেনা। তবে সমাজে বিদ্যমান "অতিপ্রাকৃত" বিষয় সমূহের প্রভাব ও তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করে। যেমন- স্রষ্টার অস্তিত্ব আছে কি নাই তা প্রমান বা অপ্রমান করা নিয়ে সমাজবিজ্ঞানের বিশেষ মাথাব্যাথা নাই। তবে স্রষ্টার অস্তিত্ত্ব বা অনস্তিত্ব বিষয়ক ধারনা সমাজে কী ধরনের প্রভাব বিস্তার করছে তা সমাজবিজ্ঞানের গবেষণার বিষবয়বস্তু হতে পারে।

মনে রাখতে হবে, সমাজবিজ্ঞানের গবেষনা পদ্ধতি বিজ্ঞানভিত্তিক হলেও তা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের গবেষনা পদ্ধতি থেকে কিছুটা আলাদা।

সামাজিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখা সমাজের বিভিন্ন অংশ নিয়ে অধ্যয়ন করে। যেমন- রাষ্ট্রবিজ্ঞান সমাজের রাজনীতি নিয়ে, অর্থনীতি সমাজের অর্থনৈতিক বিষয় নিয়ে এবং সামাজিক নৃবিজ্ঞান সমাজের সংস্কতি নিয়ে অধ্যয়ন করে। অন্যদিকে সমাজবিজ্ঞান সামাজিক বিজ্ঞানের সকল শাখার মধ্যে সামগ্রিক সমন্বয় সাধন করে সমগ্র সমাজ ও সমাজব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করে।

সমাজবিজ্ঞানের জনক অগাস্ট কোৎ তার বিখ্যাত "বিজ্ঞানের উচ্চক্রমে" (science of hierarchy) সমাজবিজ্ঞানকে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখা যেমন গণিত, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ইত্যাদির উপরে স্থান দিয়েছেন। কারন তিনি মনে করতেন সমাজবিজ্ঞান অন্যান্য বিজ্ঞানের পরে এসেছে এবং তা বিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার জ্ঞানকে ব্যবহার করে সবচেয়ে জটিল বিষয় "সমাজ ও সামাজিক মানুষের আচরন ও ক্রিয়া" কে অধ্যয়ন করে মানবজাতির কল্যান সাধন করবে।

* Harari, Yuval Noah (2014). Sapiens: A Brief History of Humankind

No comments:

Post a Comment